ছোটবেলায় পড়া, আমেরিকার মাদাগাস্কার দ্বীপে অবস্থিত এক ‘মানুষখেকো’ গাছের কথা মনে পড়ে গেল! আজকের এই লেখায় সেই গাছের ছোট্ট একটু কাহিনি বিবৃত করি।
মানুষখেকো ওই গাছটি ছিল অসংখ্য ডালপালা বেষ্টিত, দেখতে খুবই সুন্দর। কিন্তু ওই গাছের এত সৌন্দর্য শ্রীর আড়ালে কদর্য একটি রূপ আছে, বাইরে থেকে মানুষ তা জানতো না। বাইরে থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ, ভিতরে ছিল তার মরণঘাতী নিষ্ঠুর শোষণ। ওই গাছটির বাস্তব বিবরণ তাহলে একটু বলি…
ভুলক্রমে বিশ্রামের আশায় গাছ তলায় কেউ গেলে ডালপালা গুলো আস্তে আস্তে প্রসারিত হয়। তারপর শিকারটিকে (প্রাণী/মানুষ) তার প্রসারিত ডালপালার দ্বারা মুহূর্তে কঠিনভাবে জাপটে ধরে, আটকে ফেলে। শিকারটি কোনো চিল্লাপাল্লা বা কোনো শব্দ করতে পারে না। আস্তে আস্তে শিকারটি জ্ঞান হারায়। মানুষখেকো গাছটি তার ডালপালার স্পর্শ দিয়ে, শিকারের রক্ত চুষতে থাকে। এভাবে সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা কেটে যায়। সময় প্রলম্বিত হয়। কয়েক ঘণ্টা পরে ডালপালার সাহায্যে শিকারের রক্ত চুষে খাওয়া শেষ হয়ে গেলে, হতভাগ্য শিকারটি (মানুষ/প্রাণী) রক্তশূন্য একটি কঙ্কালে পরিণত হয়। তখন গাছটি আবার তার হিংস্র রূপ ত্যাগ করে, সুশ্রী সুন্দর রূপ ধারণ করে, পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে। বিচিত্র কাহিনি তাই না?
এই কাহিনিটির অবতারণা করতাম না। কিন্তু বাংলাদেশে সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করা বন্ধুদেশ(?) ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর কতিপয় মুখরোচক কথা শুনে উপরের কাহিনিটি পাঠকদের বিনোদনের জন্য তুলে ধরলাম। আমাদের দেশে দায়িত্ব নিয়ে আসা এবারের ভারতীয় ঝানু হাইকমিশনার মহাশয় রসিক ও রহস্যপ্রবণ মানুষ, সে সম্পর্কে পরে বলবো, আগে চুম্বক কথাগুলো বলে নেই।
সংবাদপত্রের খবর : ‘বাংলাদেশিদের জন্য টুরিস্ট ভিসা চালু করলো ভারত।’ প্রায় দুবছর পর বাংলাদেশিদের জন্য আবার টুরিস্ট ভিসা চালু করলো ভারত। এজন্য গতকাল রবিবার থেকে আবেদন করা শুরু হয়েছে। আর ভিসা প্রদান শুরু হবে আগামী পহেলা জুলাই থেকে। গত ২৫ জুন বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ঢাকার ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ব্যাপারটি যেন ভাবে সপ্তমী! দুই বছর পর তিনি শুধু টুরিস্ট ভিসার কথা ঘোষণা করেননি, আরও বলেছেন, মুখরোচক অনেক কথা। ওর সাথে মেডিকেল ভিসাও থাকছে। আমাদের লোকসমাজে যেমন বিরিয়ানির সাথে একটু সালাদ না হলে, খাদ্য তেমন সুস্বাদু তৃপ্তিকর মনে হয় না, ঠিক সেই রকম আর কি!
সদ্য বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণ করা ভারতীয় এই রাষ্ট্রদূত জানান, টুরিস্ট ভিসার পাশাপাশি বাংলাদেশিদের জন্য মেডিকেল ভিসা কার্যক্রমও চালু থাকবে। ভারতীয় হাই কমিশনের অধীন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট মিলে মোট পাঁচটি ভিসা সেন্টার থেকে আবেদনকারীরা সেবা নিতে পারবেন। ওই হাই কমিশনার আরও বলেছেন যে, ভারত সরকারের ভবিষ্যতে ভিসা সেন্টার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি যারা মেডিকেল ভিসা পাওয়ার আশা করছেন, তাদের শিশু ও প্রতিবন্ধী আবেদনকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
খবরটি যারা ভারতে বিশেষ চিকিৎসা সেবা নিতে আগ্রহী, দীর্ঘ দুবছর পর তাদের কাছে বুকে কফ জমানো শীতের শেষে, ফাল্গুনের এক চিলতে দক্ষিণা মলয়ের মতো মনে হলেও, সাধারণ মানুষ এত ভালো খবর ভালো চোখে নেয়নি। এ খবরে বেশি একটা আগ্রহী নন। ইতোমধ্যে সর্বত্র আওয়াজ উঠেছে : বাংলাদেশের রাজধানী শহরে ভারতীয় হাই কমিশনের একটি কার্যালয় থাকলেই যথেষ্ট–চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা কিংবা সিলেটের হাই কমিশন অফিস গুলো বন্ধ করে দেওয়া হোক।
ভারতের এই নবনিযুক্ত হাইকমিশনার নাকি একসময় ভারতের রেলমন্ত্রী ছিলেন। হাই প্রোফাইলের লোক। এত বড় হাই প্রোফাইলের ব্যক্তিকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়েছে কী উদ্দেশ্যে, আমাদের মতো মোটা মাথাওয়ালাদের তা বিশেষ বোধগম্য নয়। বেনাপোল বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে প্রথম যেদিন প্রবেশ করেন, সেদিন তিনি বেশ বিচিত্র অর্থপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন। উনার মতে, ভারতের প্রকৃতির মতো বাংলাদেশের প্রকৃতি ও নাকি একই। এখানকার আলো বাতাস আকাশ নাকি ভারতের সাথে পৃথক করা যায় না। তার মনে হয়েছে আমি ভারতেই আছি। এসব কথা শুনে ওই অঞ্চলের স্থানীয় কতিপয় পা চাটা সাংবাদিক বলেছেন, আমরা ছোট্ট একটি দেশ। আমাদের মনে রাখবেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার আর একঘাট এগিয়ে মনের কথাটা ডিপ্লোম্যাটিক ভাবে বেশ রস করে বলেছেন, ভারতের ১৪০ কোটি জনতার সাথে বাংলাদেশের বিশ কোটি এক হলে অভিন্ন সত্তার একটি অবিচ্ছিন্ন সুন্দর শক্তির সম্মিলন ঘটবে। ভারতীয় এই ভদ্রলোক বাংলাদেশে এসেছেন কী মতলবে, তা আমরা জানি না। তবে তাঁর উপলব্ধি এবং বয়ান শুনে বেশ পিলে চমকে যাবার অবস্থা। লোকটি বলে কী, বাংলাদেশের জন্য তার এত আবেগ যে ভারতের সাথে বাংলাদেশকে একাকার করে ফেলতে চাচ্ছেন! ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশের বিগত ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতা কি তাই বলে?
ভারতীয় এই অতি বুদ্ধিমান হাইকমিশনার যখন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন, তখন বাংলাদেশ ভারত দু’দেশের সম্পর্ক প্রায় আদায় কাঁচকলায় অর্থাৎ সাপে-নেউলে সহজ বাংলায় সাপ আর বেজির সম্পর্ক! ঠিক তখন তিনি বাংলাদেশে পা রেখে এমন মুখরোচক কথা বলছেন! ভারত আমাদের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া, একটি চরম চির শত্রু দেশ তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ওরা পারলে একদিনে বাংলাদেশ দখল করার হুমকি দিচ্ছে। কখনো বলছে সাপ এবং কুমির ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশকে শায়েস্তা করবে। ভারতীয় ভাবনার ওই ইশারায় পরিচালিত সাড়ে তিন বছরের সাবেক সরকার প্রধান শেখ মুজিব ১৯৭১ এর ৭ই মার্চের ভাষণে পাকিস্তানিদের উদ্দেশ করে বলেছিল, ‘তোমরা ব্যারাকে থাকো আমাদের ব্যাপারে নাক গলিও না। নইলে তোমাদের ভাতে মারবো পানিতে মারবো।’ ঠিক অনুরূপভাবে, ভারত আমাদের দেশের উত্তর অঞ্চলের কৃষি আবাদযোগ্য জমি জ্যৈষ্ঠ মাসে ফারাক্কা- গজল ডোবার পানি আটকে রেখে এই অঞ্চলের হতভাগা চাষীদের নির্দয়ভাবে শায়েস্তা করে। আবার বর্ষাকালে ভাদ্র মাসে গজল ডোবার ১০৯ টি গেট খুলে দিয়ে দিব্যি এ অঞ্চলের মানুষের গবাদি পশু, ফসল, ঘরবাড়ি, সহায়- সম্পদ পানির প্লাবনে ভাসিয়ে দিয়ে মজা দেখে। এই হচ্ছে প্রতিবেশী দেশের বন্ধুত্বের নমুনা!
বাংলাদেশ সীমানায় কর্মরত কৃষক কিংবা নদীতে মাছ শিকারে ব্যস্ত জেলেদেরকেও কথা নেই বার্তা নেই, ভারতীয় বিএসএফ দস্যুরা নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। এই কি বন্ধুত্বের নমুনা? চরম জিঘাংসা উন্মত্ত ভারতীয় বিএসএফ সিপাহিরা কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে হত্যা করে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখলো, সমগ্র পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখল! এটাই কী ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সুন্দর বন্ধুত্বের আলামত?
বাংলাদেশে নতুন দায়িত্ব নিয়ে আসা অত্যন্ত অভিজ্ঞ প্রবীণ এবং খোশ মেজাজি এই হাই কমিশনার যেচে মেডিকেল ভিসা, টুরিস্ট ভিসা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে এত কিছুর পর ‘গরু মেরে জুতা দান’ করতে চাচ্ছেন কেন, তা পাবলিকের বুঝতে মোটেও বাকি নাই। যে ভারত বাংলাদেশকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় দখল করতে চায়, সীমান্তে ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি বলে পুশ করার হুমকি দেয়, বছরে সীমান্তে গুলি করে গড়ে ৫০/৬০ জন বাংলাদেশি মানুষের লাশ উপহার দেয়, হঠাৎ করে তার মতিগতি পরিবর্তন মোটেও ভালো ইঙ্গিত বহন করে না।
উপসংহারে বলা যায়, মেডিকেল ভিসায় ভারতে যাওয়া নাগরিকদের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, সেখানে চিকিৎসার জন্য কিংবা ভ্রমণের জন্য যাওয়া নাগরিকদের পদে পদে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ওরা বাংলাদেশিদের পেয়ে নানাভাবে হেনস্তা করে পশুর মতো আচরণ করে। তারপরেও টুরিস্ট ভিসা, মেডিকেল ভিসার টোপ গ্রহণ করবে সেইসব লোক, যাদের ওপারে আত্মীয়-স্বজন আছে, এ দেশের সম্পদ দেদারসে সুকৌশলে ওপারে পাচার করে এ ধরনের উৎসাহী লোক। দেশের এই ক্রান্তি মুহূর্তে আশা করি, যারা বিবেকবান দেশপ্রেমিক এবং ভারতের কুৎসিত মনোভাব সম্পর্কে অবগত, তারা অন্তত জেনে শুনে ওদের পাতা ফাঁদে কোনোভাবে পা দেবে না।
কথাগুলো অপ্রিয় হলেও সত্য, সাপ কুমির এবং বাঘ কারো বিশ্বাসের বস্তু নয়, ফাঁক পেলে সে তার দাঁতের পাটি দিয়ে কিংবা দংশন করে উপযুক্ত জবাব দেবেই দেবে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তার জীবদ্দশায় বলেছিলেন, সাপকে বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু প্রতিবেশী ভারতকে বিশ্বাস করা যায় না। কথাগুলো আমরাও যেন দেশপ্রেমের তাগাদায় বিশেষভাবে মনে রাখি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

